গ্রামীণ সলিউশন ও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি

আমি জানুয়ারী ২০০৮ এর দিকে বাংলাদেশে যাবার পরপরই তৌহিদের সাথে যোগাযোগ করি, এবং তার কাছেই জানতে পারি যে ড. ইউনুস একটি নতুন বই লিখেছেন। সেই সময় তৌহিদ প্রথম আমাকে গ্রামীণ সলিউশনস এর প্রধান কাজী ভাইয়ের সাথে পরিচয় করে দেয়। কাজী ভাই্ও আমার মত বিদেশে ঘুরে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাই কাজি ভাইয়ের সাথে কাজ করতে কিছুটা সস্তি বোধ করছিলাম। প্রথমেই আমাকে কাজি ভাই, আমাকে সাধুবাদ জানালেন গ্রামীণ সলিউশনস-এ একসাথে কাজ করার। এবং কাজি ভাইয়ের সহায়তার কারণে সেখানে বেশ কিছূ প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। অবশ্য উল্লেখ্য যে আমি বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করেছিলাম, অনেকে বলেছিলো এইভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে লাভ আছে। আমার তখন বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা শুন্যের কাছাকাছি, তাই আমার জন্য কোন একটি জায়গা থেকেই শুরু করতে হবে। তাই গ্রামীণ সলিউশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইন্ডাস্ট্রি সমন্ধে শিখা শুরু করলাম।

গ্রামীণ সলিউশন সে সময় জাপানের মার্কেটে ঢুকবার চেষ্টা করছিল, এবং আমি তাদেরকে সেই ব্যাপারে সহায়তা করেছিলাম। আমার যেহেতু জাপানের কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল, তাই এটা খুব সাহায্য করেছিল। আমরা চেষ্টা করছিলাম জাপানের বাজার থেকে কিছু কাজ বাংলাদেশে নিয়ে আনতে। জাপানে আমি যোগাযোগ করলাম আলম ভাইয়ের সাথে। আলম ভাই সেই সময় আবে নামে এক জাপানিজের সাখে যৌথভাবে একটি কম্পানি তৈরী করেছিল বাংলাদেশ ও জাপানের মাধ্যে ব্যবসা বিস্তারের জন্য। তাদের একটি অংশে তথ্য প্রযুক্তি ছিল, এবং আমি্ও তাদের সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কাজ করার জন্য চেষ্টা করেছিলাম। আমরা বেশ কয়েকবার টেলিকনফারেন্স করলাম, এবং টুকটাক কিছু কাজ শুরু হলে্ও প্রোজেক্টটি খুব একটা এগোয়নি। আসলে মূল সমস্যা এইখানে ভাষা। কেননা কিছুকিছু যোগাযোগে আমি সহায়তা করলে্ও প্রতিটি ক্ষেত্রে ভাষার অনুবাদ করাটি কঠিন। একটি প্রোজেক্ট যখন শুরু হল তখন ইঞ্জিনিয়াররা কাজ শুরুল, তখন ভাষাগত সমস্যাটি প্রকট হ্ওয়া শুরু করল। জাপানে আমার আরো ভালোকিছু যোগাযোগ থাকলেও, এই সমস্যাগুলি উপলব্ধি করে আর সেগুলি নিয়ে আগান হয়নি। তবে একটি কথা উল্লখ্য, জাপান ও বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে যেয়ে বুঝতে পারলাম যে জাপানিজরা আউটসোর্সিই শব্দটির সাথে একেবারেই অপরিচিত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যখন বেশ জোরেসোরেই তাদের আনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রোজেক্টগুলির খরচ কমানোর জন্য আউটসোর্সিই করছে, জাপান তখন একেবারেই আউটসোর্স করছেনা। করলেও শুধুমাত্র চীন ও তাই্ওয়ান সহ কিছু দেশের সাথেই সীমাবদ্ধ। জাপানের এই মনভাবের কারণে বুঝতে পারলাম যে, আসলে জাপানিজরা আউটসোর্সিং কনসেপ্টে বিশ্বাস করেনা। জাপানীজরা কাজের ব্যাপারে যেরকম খুতখুতে তা আউটসোর্সের মাধ্যমে ডেলিভার করা সম্ভব নয়। সেই সময় বেসিসের উদ্দ্যোগে আয়োজিত সফট্ওয়্যার মেলাতে আমি গ্রামীণ সলিউশনকে সাহায্য করলাম জাপান থেকে আগত প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে যোগাযোগ করে দেবার।

পরবর্তিতে বুঝতে পেরেছি যে আসলে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রি সেই সময় ভারতের আউটসোর্সিং মডেলকে ফলোকরছিল। বাংলাদশের লোকজন সেই সময় ভাবছিল আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রটি যেহেতু বিশাল তাই ভারত থেকে্ও কিছু কিছু কাজ বাংলাদশে আসলে সেটি অংকে কম হবেনা। আসলে এই এপ্রোচের মধ্যে একটি ভুল ছিল। আসলে বাহির থেকে ভালো কাজ পেতে হলে ভালো কিছু কানেকশন এর প্রয়োজন, যেটি ভারতের ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাহিরে ভালো কানেকশন ছিলনা, অন্তত ভারতীয়দের মত ভালো নয়। ব্যাপারটি একটু বিস্তারিত বলি। আউটসোর্সিং এর কাজ যদিও বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই বিড (অনেকটা অকশনের মত) করে আনা যায়, তারপরে্ও ভালো কাজ পাবার জন্য বিদেশে ভালো কানেকশন দরকার। ভারতীয়রা সেই সময় বিদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানেই উপরের ম্যানেজমেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পজিশনগুলিতে ছিল। যেমন অনেক মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির এমডি বা সিইও আপনি পাবেন ভারত থেকে। তাই ভারতে পক্ষে বিদেশের কাজ বিশেষ করে আমেরিকা থেকে কাজ পেতে সুবিধা হয়েছে। বাংলাদেশীরা ভারতীয়দের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। তাই বিডিং এর মাধ্যমে খূব নগন্য হাতে গোনা কিছূ কাজ আমাদের আসছিল। অল্প কিছু কাজ পেয়েই আমি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের সন্তুষ্ট থাকতে দেখেছি, এর বেশী চিন্তা করার শক্তি ও সামার্থ হয়তো আমাদের নেই।

আমি পরবর্তিতে এই আউটসোর্সিং এর কনসেপ্ট বাদ দিয়ে প্রোডাক্ট এর দিকে গুরুত্ব দিই। একটি প্রতিষ্ঠানের বাজারের জন্য ভালো কিছু প্রোডাক্ট থাকলে তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যান্ডিং করা সম্ভব, যেটি শুধুমাত্র আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে করাটি কঠিন।

গ্রামীণ সলিউশনস এর কাজ করার সময় আমি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের সাথে মিশতাম, তাদের কাজ করার পদ্ধতি, স্কিল ও প্রোজেক্টগুলি সমন্ধে জানতাম। তাদের সাথে মিশে বুঝার চেষ্টা করতাম আমাদের তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রটিকে। বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে এই হোম্ওয়ার্ক করে একটি ভয়ংকর চিত্র পেলাম। আমি লক্ষ করলাম বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা একটু চিটিং স্বভাবের আছে। এরা অনেকেই দিনের বেলায় একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে এবং রাতে বাসায় ফিরে আউটসোর্সিং এর কাজ করে। দিনের কাজটি তার মাসিক বেতন তুলবার এক ব্যবস্থা আর আউটসোর্সিং এর কাজটি তার সাইড ইনকাম করার মত। এক সাথে এইভাবে দুটি দিকে কাজ করলে যে কোনটিই ঠিকমত হয়ে উঠেনা তা বোধদয় করবার মত সাবালক তারা হয়ে উঠিনি। জুনিয়র থেকে শূরু করে সিনিয়র সব ইঞ্জিনিয়ারদেরই এই অবস্থা। আমার মন হয় পেশাদারিত্বের এই অভাবের কারণে, বাংলাদেশ সামগ্রিক ভাবে এগুতে পারছেনা। কেননা বাহির থেকে কাজ নিয়ে আনলে্ও কাজ করাতে হচ্ছে বাংলাদেশের এই সমস্ত প্রযুক্তিবিদদের দিয়েই।

(চলবে)

আমরা আমাদের প্রোপজালের নাম দিয়েছিলাম, E-HEALTH CARE SOLUTION BY USING TOUCH SCREEN KIOSK. আমরা এই টাচস্ক্রীন কিউসক এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যসেবার পাশাপাশি ডাক্তার ছাড়াই কিছু সাধারণ টেস্টগুলি করা যাবে। আমরা নিম্নের টেস্টগুলি করার কথা বলেছিলাম,

  • ইলেকট্রনিক্স স্টেথেস্কোপ
  • ইসিজি মনিটর
  • ব্লাড প্রেসার মিটার
  • ব্লাড সুক্রোজ মনিটর
  • ওমন মাপার যন্ত্র

ভবিষ্যতে এই কিউসক দিয়েই টেলিমিডিসিন বা দূরের ডাক্তারের সাথে কনসাল্টেশন করার সুযোগ রাখতে পারবো।

ড. ইউনুসকে যখন আমাদের আইডিয়াটি দেখালাম, তখন উনি খুব মনযোগ দিয়ে শুনলেন। শেষে আমাদের বললেন, আইডিয়াটি চমৎকার তবে আমাদের দেশে প্রয়োগ করার জন্য আরো কিছু পারিপার্শিক জিনিসগুলি নিয়ে ভাবতে হবে।

  • তথ্য দেয়া হবে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে। আমাদের গ্রামের লোকজন এটিকে কিভাবে নিবে, তা ভাবতে হবে।
  • গ্রামে বিদ্যুতের সংযোগ নাও থাকতে পারে, কিংবা বিদ্যুত মাঝেমধ্যে চলে যেতে পারে। এখানে তোমরা সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি এর কথা ভেবেছে।
  • বিজনেস মডেলটি একটু দূর্বল রয়েছে। আমরা বিজনেস মডেলে বলেছিলাম যে তথ্য দেয়া বাবদ একটি চার্জ নেয়া যেতে পারে। হয়তো একটি প্রিন্টার লাগানো যেতে পারে যেখানে প্রিন্ট করলে একটি চার্চ নেয়া হবে। এমেশিনে যে টেস্টগুলি করা হবে, সেই টেস্টগুলি বাবদ একটি চার্জ নেয়া যেতে পারে। উনি বললেন এই সামান্য চার্জ গুলি দিয়ে ব্রেকইভেন কিংবা লাভজনক করা একটু কঠিন হবে।
  • আমাদের গ্রামে যদি এমন একটি জিনিস বসায়, সেখেত্রে এটি রক্ষনাবেক্ষণের জন্য লোক প্রয়োজন হবে। আমরা সাধারণ ফার্মেসিগুলিতেই তা বসাতে পারে তাদের একটি নতুন সার্ভিস হিসাবে সংযুক্তি করতে পারি।
  • আমরা এমন একটি যন্ত্র তৈরী করতে কেমন খরচ হবে ত হিসাব করে বলেছিলাম। কিন্তু কত বছরে লাভের টাকা তুলে আনা যাবে তা বের করতে পারিনি।
  • পরিশেষে আমাদের কিছু কথা বললেন, যেখানে উনার দর্শন আমাদের সাথে শেয়ার করলেন। এই কথাগুলি আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল এবং পরবর্তিতে আমার কাজে এটি বেশ ভুমিকা রাখে।

ড. ইউনুস বললেন, দেখো মশিউর। আমরা মানুসের সেবা বিভিন্ন ভাবে করতে পারি। আমি একজন মানুষকে চা খাওয়ালাম, তাও কিন্তু এক ধরনের সেব। কিন্তু শুধু মাত্র বিনামূল্যে সেবা নয়, সেই সেবাটিকে যদি আমরা একটি বিজনেসের মডেলে নিয়ে আনতে পারি, তবে তাতে আমার সেবার কাজটিও হল আর সেই সাথে এটি একটি sustainable হল, বা সেই প্রোজেক্টটি নিজে নিজেই চলার ক্ষমতা অর্জন করল। লাভ করাটি পরে চিন্তা করা যেতে পারে। কিন্তু একটি প্রোজেক্টকে কিভাবে সাসটেইনেবল করা যায় সেদিকেই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের প্রোপজালটি তিনি বাদ দিয়ে দেননি, কিন্তু বললেন যে এটিকে সত্যিই সাসটেইনেবল করার জন্য আমাদের পদ্ধতি বের করতে হবে। এইরকম একটি সিস্টেম তৈরী করতে খরচ আছে, সেই খরচ কিভাবে তুলে আনতে হবে, কতদিনে তুলতে হবে তা আমাদের বুদ্ধি খাটিয়ে বের করতে হবে, অন্তত সংখার অংকগুলি যেন মিলে।

পরবর্তিতে এই প্রোজেক্ট কাজ করা ছেলে-মেয়েরা এটি তাদের কোর্সের প্রোপজাল হিসাবে জমা দিয়েছিল। এবং তা তাদের শিক্ষার একটি অংশ হিসাবেই ছিল। পরবর্তিতে এপলো এই প্রোপজালটিকে কোন এনজিও এর কাছে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা, তা নিয়ে চেষ্টা করেছিল কিন্তু তা খুব একটি সফল হয়নি। আমাদের গ্রুপের সবাই অন্যান্য পোজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর এটি নিয়ে কাজ হয়নি। আসেই এই আইডিয়াটিকে বিজনেস মডেলে রূপান্তর করা খুবই চ্যালেঞ্জিং এবং শুধু মাত্র একটি কোর ব্যবসা হিসাবে চালানো হয়তো কঠিন হবে। যারা এই সংক্রান্ত কাজ করে তাদের জন্য এটি একটি পাশাপাশি প্রোডাক্ট হিসাবে কাজ করতে পারে। যারা এনজিও তারা বিভিন্ন ধরনের আইডিয়া নিয়ে ফান্ড সংগ্রহ করে, তাদের জন্য হয়তো এটি সুন্দর একটি মডেল, কিন্তু সতন্ত্র একটি বিজনেস মডেল নয়। এই জিনিসটি আমরা উপলব্ধি করেছিলাম।
এই প্রোপজালটি নিয়ে আমি সার্থক হইনি। কিংবা এই আইডিয়াটি সূর্যের মূখ দেখেনি। সেটি নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। তবে এর মাধ্যমে একটি নতুন শব্দ শিখেছিলাম, business model – বিজনেস মডেল। এবং কোন প্রোজেক্টকে কিভাবে sustainable করা যেতে পারে সে ব্যাপারে সিরিয়াসলি চিন্তা ভাবনা করার পদ্ধতি শিখতে পেরেছিলাম। পরবর্তিতে আমার জীবনে আমি অনেক প্রোজেক্টের মুখোমুখি হই এবং ড. ইউনুসের কাছ থেকে শেখা চোখে – একটি প্রোজেক্টকে কিভাবে যাচাই করতে হবে, তার মূলমন্ত্র শিখি। এই শিক্ষাটিই আমি ড. ইউনুসের কাছে পেয়েছিলাম।

 

(পরিশেষে: প্রায় বছরখানেক পরের কথা, আমার এক ছাত্র চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র থেকে একটি ছবি নিয়ে এনে দেখাল। যেখানে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান ঠিক একই রকমের টাস স্ক্রীণে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কিছু কিউসক প্রদর্শনিতে এনেছিল। আমি অবশ্য আর বিস্তারিত জানিনা। আমরা এই আইডিয়াটিকে ব্যবসাতে রূপান্তরে করতে না পারলেও ভারতের ব্যাঙ্গালোরে অবস্থিত নিউরোসিনাপটিক কমিউনিকেশন  Neurosynaptic Communications নামে একটি প্রতিষ্ঠান ReMeDi™নামে একটি ডায়াগনোসিস সিস্টেম বাণিজ্যিকভাবে তৈরী করেছে যা দূরে বসেই টেস্টগুলি করা যাবে। তাদের যন্ত্রে  শরীরের তাপমাত্রা, রক্তের চাপ, ইসিজি ও স্টেথেস্কোপ (হার্টবিট) মাপা যাবে। )

 

(চলবে)

Tags: , , , , ,

যদিও আমরা বিভিন্ন আইডিয়া নিয়ে কাজ করছিলাম। তারপরেও এই সংক্রান্ত আমাদের আইডিয়াগুলির সাথে ড. ইউনুসের আইডিয়া ও লক্ষ্যগুলি সমন্বয় করার জন্য আমরা ড. ইউনুসের সাথে ১৪ই মে ২০০৮ তারিখে দেখা করি। যেহেতু ছাত্র/ছাত্রীদের সাথে এটিই প্রথম মিটিং ছিল তাই তারা খুবই আগ্রহী ছিল। মিটিংটিতে আমরা কোন আইডিয়া বা প্রোপজাল নিয়ে যায়নি। মূলত brainstorming (বাংলা অনুবাদ করলে কি হবে?) মিটিং ছিল। বেশ কিছু তথ্য আমরা পেলাম।

  • বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রটি অনেক বড়। ড. ইউনুসকে জিজ্ঞাস করেছিলাম স্বাস্থ্যসেবার কোন ক্ষেত্রটি বেশী চ্যালেঞ্জিং হিসাবে দেখেন? তিনি বললেন শিশুর স্বাস্থ্য সেবা ও গর্ভবতী মা’র স্বাস্থ্য সেবা। গ্রামীন অনেকদিন ধরেই গ্রামের মানুষদের স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কাজ করছে। ড. ইউনুস বলছিলেন যে গ্রামীণ এর বিভিন্ন সার্ভে তে দেখা গেছে, এবং উনার কাজ করতে করতে শিখতে পেরেছিলেন যে এই দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক বেশী পিছিয়ে রয়েছে। বড়দের স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে গুরুত্ব দেয়া হলেও এই দুটি ক্ষেত্র এখনও অবহেলিত।
  • রাতুল টেলিসেন্টার এর আইডিয়া এর কথা বললে ড. ইউনুস জানালেন যে গ্রামীন অনেক আগে এই নিয়ে কাজ করেছে। BARDEM  ও গ্রামীন টেলিকম একটি প্রোজেক্ট করেছিল যেখানে ফরিদপুরের একটি গ্রামের সাথে বারডেমের মধ্যে ভিডিও সংযোগ ছিল এবং রোগীরা সেখানে বসেই ঢাকার ডাক্তারদের সাথে কথা বলতে পারতো। কিন্তু ড. ইউনুস জানালের যে এই সেটআপটি এখনও আছে কিন্তু পুরো আইডিয়াটি কাজ করেনি।
  • আমাদেরকে উনি ইনটেলের কাজি এমদাদের সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। (পরবর্তিতে আর ফলোআপ করা হয়নি)
  • ড. ইউনুস আমাদের বললেন, খুব সাধারণ কিছু তৈরী করা যায় কিনা।
  • কি কি রোগ নিয়ে কাজ করা যায়, এই ব্যাপারে আমি প্রশ্ন করেছিলাম। ড. ইউনুস বললেন আমাদের অফিস ডা. বাকি আছেন এবং তিনি একটি হোমওয়ার্ক করেছিলেন কোন কোন রোগগুলি আমাদের বেশী হয় তার উপর। এই পর্যায়ে এসে লামিয়া আপা বললেন পরে তিনি ইমেইলে আমাদের রোগগুলি লিস্ট করে পাঠাবেন। ড. ইউনুস তখন বললেন ডা. বাকি তো এই অফিসেই আছে, তাকে ডাকুন। একটু পরেই ডাক্তার বাকি আমাদের সাথে যোগ দিলেন এবং তিনি জানালেন যে নিম্নের রোগগুলির গুরুত্ব আমাদের দেশে বেশী। (ড. ইউনুস সাথে সাথেই যে ডা. বাকি কে ডাকলেন তাতেই বুঝলাম যে উনি কাজ পরে ঝুলে রাখবেন তা নয় যতটুকু সম্ভব কাজ এগিয়ে রাখার মানুষ তিনি। পরবর্তিতে অনেক বড় বড় ম্যানেজারের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং আমি দেখেছি ভাল ম্যানেজারদের একটি গুন হল কাজকে এগিয়ে রাখা, পরে কিছু করব তা নয়। ড. ইউনুসের এই গুণটি আমাকে খুব অনুপ্রানিত করল)।
  • পেপটিক আলসার
  • এনেমিয়া বা অপুষ্টি
  • চোখের রোগ
  • হজমতন্ত্রের রোগ
  • ডাইরিয়া

 

সেদিন আলোচনার করে আমরা বুঝলাম যে আমাদের খুব সহজ মডেল নিয়ে এগুতে হবে। সেদিন যে আলোচনা করলাম তার সারাংশ পরে ড. ইউনুসকে পাঠিয়ে দিলাম।

 

আমার খাতার নোটটি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।

 

স্বাস্থ্য সেবার আইডিয়া এর পাশাপাশি ওয়েবসাইটের কাজ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ড. ইউনুস নিজে ব্লগ লিখার আগ্রহ প্রকাশ করছিলেন। আমি তাকে উৎসাহ দিই। কিন্তু পরবর্তিতে অনেক চেষ্টা করেও ড. ইউনুসকে ব্লগ লিখাতে পারিনি। আমার মানে হয় লামিয়া আপাও অনেক চেষ্টা করেছিলেন। আসলে ড. ইউনুস খুব ব্যস্ত বলেই হয়ত লেখার সময় পাননি। ড. ইউনুসের সাথে কাজ করে আমার মনে হয়েছে, আমাদের বাংলাদেশের অনেক সেক্টর নিয়েই উনি কাজ করেছেন এবং উনার অনেক প্রোজেক্টগুলি আমাদের অনেকের অজানা। উনি যদি এগুলি ডকুমেন্ট করে রাখতেন তাহলে এই ব্যাপারে যারা কাজ করেন তাদের অনেক উপকার হোত।

এই সময় ড. ইউনুসের সাইটের ডিজাইন পরিবর্তন নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম। ড. ইউনুস একটি প্রতিযোগীতা আয়োজন করা যায় কিনা যেখানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীরা ডিজাইন তৈরীতে অংশ নিবে। আমরা এমন একটি ওয়েবডিজাইন প্রতিযোগীতার ব্যাপারও কথা বললাম।

 

Tags: , , , ,

একদিন আমার অফিসে এপলো বলে একজন ছাত্র এল। খুব সম্ভবত রাতুলই আমাদের টিমে এপলোকে নিয়ে এনেছিল। এপলো এর ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এবং অভিজ্ঞতা দুটিই ছিল। আমরা তাকে আমাদের অগ্রগতি জানালাম। কিছুদিন পরে এপলো একটি চমৎকার আইডিয়া নিয়ে এল যা আমাদের টিমের কাজ অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেল।

এপলো স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যগুলি একটি kiosk বা টার্মিনাল এর মাধ্যমে দিতে চাচ্ছিল। একটি টাচস্ক্রীন মনিটর থাকবে যেটি দিয়ে খুব সহজেই স্বাস্থ্য সেবার তথ্য পাওয়া যাবে। এপলো এমন একটি টার্মিনাল নিয়ে কাজ করেছিল। তাদের একটি প্রতিষ্ঠান সাইন্সল্যাবরেটরিতে এমন একটি তথ্যকেন্দ্র বসিয়েছিল। সে একদিন সেটির ডেমোস্টেশন ভিডিও আমাদের দেখাল। আমরা বেশ মুগ্ধ হলাম। আসলে গ্রামে বা প্রতন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়না। সেই তথ্যগুলি সহজে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌছে দেবার কথা এপলো ভাবছিল। আমরা সবাই মিলে তার এই আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ দেখালাম এবং সবাই মিলে চিন্তা করতে লাগলাম কিভাবে এই টার্মিনাল টিকে আরো সমৃদ্ধ করা যায়।

 

এপলো এর আইডিয়া

পরিশেষে আমরা নিম্নের সিদ্ধান্তে এলাম।

  • যে কেউ সহজে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য এই কিউসক এর মাধ্যমে পাবে। উচ্চতা মাঝারি আকারের হবে যেন সবাই এটি ব্যবহার করতে পারে।
  • টাচ স্ক্রীণ ব্যবহার করে সহজেই তথ্য বের করতে পারবে।
  • তথ্যগুলি বাংলাতে থাকবে।
  • যদিও কম্পিউটার ব্যবহার করে তথ্য প্রদান করা হবে, কিন্তু কেউ যেন উপলব্ধি না করে যে কম্পিউটার ব্যবহার করছে।
  • কম্পিউটার চালানোর জন্য ব্যাটারি রাখা হবে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুত নেয়া যেতে পারে।

এই টার্মিনালকি কিভাবে কাজ করবে?

মূলত তিনটি ধাপে এটি প্রয়োগ করা হবে।

প্রথম ধাপ: শুধু মাত্র তথ্য থাকবে। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত, ডাক্তার, সাধারণ রোগগুলি তথ্য, আশে পাশে হাসপাতালের তথ্য ও তাদের সেবাসমূহ, আশে পাশের ডাক্তার ও তাদের তথ্যসমূহ, কোন জটিল রোগে ঢাকা বা জেলা হাসপাতালগুলিতে গেলে সেখানকার ডাক্তার ও হাসপাতালের তথ্যসমূহ। ইত্যাদি।

দ্বিতীয় ধাপ: এই ধাপে এই কিউসক এর সাথে সাধারণ রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন ডিভাইস এতে সংযুক্ত থাকবে। অটোমেটিক ডায়াবেটিস, ইসিজি মাপার যন্ত্র এর সাথে সংযুক্ত থাকবে।

তৃতীয় ধাপ: এটি একটি কমিউনিকেশন প্লাটফর্ম হিসাবে কাজ করবে। মনিটরে ভিডিও এর মাধ্যমে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে পারবে। দেশ বিদেশের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলির সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকবে।

 

শুধুমাত্র আইডিয়া নয় এটি প্রয়োগ করতে গেলে কি ধরনের খরচ হবে, যন্ত্রপাতিগুলি কোথায় পাওয়া যাবে তা নিয়ে আমরা হোমওয়ার্ক করলাম। ড. ইউনুসের সাথে পরের মিটিং এ আমরা এটির উপর প্রজেন্টেশন দিলাম। সেই সাথে প্রোপজালটি ইংরেজীতে টাইপ করে লিখে ড. ইউনুসের কাজে জমা দিলাম। আমরা ড. ইউনুসের সাথে দেখা করলাম ১৪ই মে ২০০৮। সেদিন যে প্রজেন্টেশন দিয়েছিলাম ও লেখাটি জমা দিয়ে ছিলাম তা এখানে পাবেন। 2008-08-12-presentation PDF, 2008-08-11-demo software, 2008-08-14-proposal-dr-yunus-e-helthcare

 

 

এমন একটি প্রোজেক্টকে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে সময় কেমন লাগতে পারে তা সাধারণত gantt chart দিয়ে সহজে প্রকাশ করা হয়। আমাদের প্রোজেক্টটির চার্ট আমরা তৈরী করেছিলাম। 2008-08-14-gantt

(চলবে)

 

 

Tags: , ,

প্রথম সাক্ষাতের পর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি এবং আমার পরিচিত ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলি। সেই সময় আমি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছিলাম এবং আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের অনার্সের শেষ বর্ষে গবেষনার কাজ করতো।  তাই আমার কাছে গবেষনার জন্য অনেক ছেলেমেয়ারা আসতো। তাদের সাথে আলোচনা করলাম, কি আইডিয়া নিয়ে ড. ইউনুসের কাছে যাওয়া যায়। অবিশ্বাস্য রকমের সাড়া আমি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে পেলাম। প্রতিদিনই তারা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আসতো। তরুনদের সাথে কাজ করার এই একটি মজা, যে তারা সবসবই নবীন চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখে। নতুন নতুন কাজের প্রতি তাদের আগ্রহী একটু বেশীই থাকে। সেই তুলনাই যারা এক্সপার্ট ও জীবনের অনেকখানি পথ পাড়ি দিয়েছে, তারাই নতুন কোন আইডিয়ার প্রতি বিরুপ থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা নতুন কিছু সহজে গ্রহণ করতে চায়না।

ড. ইউনুসের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে কোন ক্ষেত্রটিতে তিনি বেশী জোর দিচ্ছেন। উনি উত্তর দিয়েছিলেন, “স্বাস্থ্য”।

তাই আমরাও চেষ্টা করছিলাম স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যে সমস্ত সমস্যা আছে, তাকে কিভাবে নতুন আইডিয়া দিয়ে মোকাবেলা করা যায়। আমি পূর্বে বলেছিলাম আমি আমার মটো ঠিক করেছিলাম, Serving the society through technology। আমি আমার লক্ষ্যটি ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম। আমরা এমন একটি পদ্ধতি খুজছিলাম যেখানে আমাদের লব্ধ প্রযুক্তি দিয়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যা গুলিকে সমাধান করা যায়।

ছাত্র/ছাত্রীদের নিয়ে একটি টিম গঠন করলাম, যারা এটি নিয়ে হোমওয়ার্ক শুরু করল। আমরা নিয়োমিত ক্লাশের পরে মিটিং এ বসতাম কিভাবে এগুনো যায়। স্বপ্নীল ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কাজ করতে খুবই মজা পাচ্ছিলাম। আড্ডাচ্ছলে অদ্ভুত অদ্ভূত আইডিয়া আমরা তৈরী করছিলাম।

অন্যান্য দেশের মডেলগুলি আমাদের দেশে প্রয়োগ করা যায় কিনা তা নিয়ে হোমওয়ার্ক করছিলাম। আমাদের আশে পাশের দেশের মডেলগুলির উপর আমরা পড়াশুনা করছিলাম। মিটিং এর পরে ছাত্রদের হাতে আমি নতুন বৈজ্ঞানিক জার্নালের প্রবন্ধ কিংবা অন্য দেশের মডেলের উপর প্রবন্ধ দিতাম। এবং তাদের সেই পেপারটি নিয়ে পরবর্তিতে আলোচনার জন্য হোমওয়ার্ক করে আসতে বলতাম। প্রথম প্রথম তাদের বেশ সমস্যা হোত, কেননা ছাত্রদের এইরকম বৈজ্ঞানিক জার্নাল পড়ার অভ্যাস নেই। কিন্তু কিছুদিন পরেই তারা বেশ অভ্যাস্ত হলো, এবং সুন্দর করে উপস্থাপনা করে দিত। এই কাজের মাধ্যমে তাদের প্রজেন্টেশন করার অভিজ্ঞতা হোল। আসলে আমার একটি দীর্ঘ প্লান ছিল যে ড. ইউনুসের কাছে এই ছাত্রদের দিয়েই প্রেজেন্টেশনটি দিব। তাই তাদেরকে সেইরকম ভাবে তৈরী করছিলাম। আর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের একটি সুনাম ছিল, সেই সুনামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের তৈরী করতে হচ্ছিল। ড. ইউনুসের সাথে এর আগে নর্থ সাউথের কোন ছাত্র-ছাত্রী কাজ করেনি। তাই তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্চের ছিল।

যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা সেই সময় আমার সাথে কাজ করেছিল তাদের নাম গুলি নিম্নে দিলাম। এদের একটি বড় অংশ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার স্থাপিত আইপি টেলিফোনি ল্যাবে কাজ করত।

  • এপলো
  • মাবরুকা তোহা
  • মনজ প্রভাকর
  • রাতুল সাহা
  • রেহানা
  • আরো অনেকে (যাদের নাম উল্লেখ করতে পারলাম না, তারা একটু মনে করিয়ে দিও)

প্রায় দেড় মাস ধরে আমরা হোমওয়ার্ক করলাম। এর পরে আমরা আবার দেখা করতে গেলাম ড. ইউনুসের সাথে ১৪ই মে ২০০৮ তারিখে। প্রায় ৪০ দিন ধরে আমরা কাজ করলাম।

প্রথমেই আমরা গবেষনা করলাম আমাদের স্বাস্থ্য সেবার সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করতে। আমরা যত পড়াশুনা করছিলাম আমাদের করুন স্বাস্থ্য সেবা দেখে তত বেশী খারাপ লাগছিল। এবং কিছু একটি করার জন্য আমরা উদগ্রীব ছিলাম।

এর মধ্যে রাতুল কাজ করছিল “টেলিসেন্টার” জাতীয় মডেল গুলি নিয়ে। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ডাক্তার নেই, সেখানে রিমোট ভাবে (দূরথেকে) স্বাস্থ্য সেবা দেয়া সম্ভব কিনা, সেটি যাচাই করে দেখছিল। যেহেতু সেই সময় মোবাইল কম্পানিগুলি টেলিফোনের মাধ্যমে জরুরী স্বাস্থ্যসেবা দিতো তাই শুধু মাত্র ভয়েস নয়, ভিডিও এর মাধ্যমে রিমোটভাবে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া যাবে কিনা তাই চেষ্টা করছিল। পাড়াপাশি বর্তমানে যে সমস্ত মোবাইল কম্পানিগুলি এই সার্ভিস দেয়, তারা কিভাবে দেয় কত করে টাকা চার্জ করে ইত্যাদি এর উপর সে হোমওয়ার্ক করছিল।

আমরা যেহেতু শুধু মাত্র আইডিয়া তৈরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা কিভাবে প্রয়োগ করা যায় এবং কারিগরিভাবে তা প্রমাণ করে দেখাতে চাচ্ছিলাম যে যেটি বলছি তা কারিগরিভাবেও সম্ভব। তাই রাতুল বেশ হোমওয়ার্ক শুরু করলে যে আমাদের বর্তমান নেটওয়ার্ক সিস্টেম ব্যবহার করে ভিডিও এর মাধ্যমে কিভাবে তা প্রয়োগ করবে। যেহেতু সেই সময় বাংলাদেশের প্রতন্ত্য অঞ্চল পর্যন্ত ইন্টারনেট এর সংযোগ ভালো ছিলনা, তাই প্রয়োগ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে উপলব্ধি করলাম। কিছু কিছু ডেমোস্টেশন নিয়ে কাজও করলাম, কিন্তু তাতে ভালো ফল পেলাম না।

একদিন রাতুল ঢাকাতে একটি টেলিসেন্টার ভ্রমণ করে আসলো যেখানে ঢাকার রোগীরা বসে ভারতের ডাক্তারদের সাথে কথা বলতে পারে। সেখানকার কারিগরি ব্যাপারগুলি সে হোমওয়ার্ক করে এল।

মনজ, মাবরুকা সহ আরো অনেকেই বেশ কিছু আইডিয়া নিয়ে এলো। কিন্তু সেগুলি আলোচনার মাধ্যমে বেশি এগুতে পারলনা। কোন কোন আইডিয়া চমৎকার হলেও বাংলাদেশে প্রয়োগ করা কঠিন হবে বলে আমরা সেগুলি বাদ দিলাম। আমরা দেখতে পেলাম আমাদের সমস্যাগুলিকে সুন্দর ভাবে সমাধান করতে পারবে তেমন আইডিয়া বের করা খুব একটি সহজ কাজ নয়।

(চলবে)

Tags:

এই লিখাটি লিখছি সিঙ্গাপুরে বসে। আমার নতুন গবেষনার কাজের পাশাপাশি দুপুরের খাবারের সময়, একটু সময় বের করে লিখছি। বাহিরে সিঙ্গাপুরের ঝকঝকে রোদ। আজকের এই রোদটি আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ৩রা মার্চ ২০০৮ তারিখের কথা যেদিন আমি প্রথম ড. ইউনুসের সাথে সরাসরি দেখা করলাম। সেদিনও খুব সুন্দর ঝলমলে রোদ ছিল।

খুব সম্ভবত সকাল ১০ টার দিকে আমি এপয়েন্টমেন্ট পেয়েছিলাম। গ্রামীণ ভবনে এটাই আমার প্রথম ভ্রমন তা নয়। এর আগে আমি গ্রামিণ সলিউশনের সাথে বিভিন্ন কাজে গিয়েছিলাম। তাই জায়গা গুলির সাথে পরিচিত ছিলাম। ড. ইউনুসের অফিস ও কোথায় বসেন তা প্রথম আমাকে ঘুরে দেখিয়েছিল, তৌহিদ। জানুয়রী ২০০৮ এর শুরুর দিকেই তৌহিদ আমাকে গ্রামীণ ভবনটি ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। আমার এপেন্টমেন্টটি কোঅর্ডিনেট করেছিলেন লামিয়া আপা যিনি ড. ইউনুসের সেক্রেটারি হিসাবে কাজ করছিলেন। জাপানের নিয়ম অনুসারে ১৫ মিনিট আগেই যেয়ে পৌছলাম। মূল ভবনের সিকিউরিটি জানাল আমার নামে এপেন্টমেন্ট আছে। প্রথমে লামিয়া আপার সাথে দেখা করলাম, উনি একটু পরে আমাকে ড. ইউনুসের রুমে নিয়ে গেলেন। রুমে ঢুকেই দেখি খুবই সাধারণ একটি চেয়ার-টেবিলে বসে ড. ইউনুস আমাকে অভার্থনা জানালেন। রুমটি বাংলাদেশের আর দশটা ঘরের সাইজের একটি ঘর। খুবই বড় একটি রুম নয়। এমন সাধারণ একটি রুম দেখে সত্যিই অবাক হলাম। রুমে কোন কম্পিউটার নেই, পিছনের সেলফ-এ কিছু বই আছে। আর উনার ডেস্কের উপর খুব নগন্য কিছু কাগজ। বুঝলাম খুব ঠান্ডা মাথায় কাজ করবার মত পরিবেশ তৈরী করে নিয়েছেন। আমার এক সহকর্মী বলেছিলেন মানুষের টেবিল দেখেই বুঝা যায় কে কেমন করে কাজ করে। ড. ইউনুসের সাদামাটা রুম দেখে সত্যিই অবাক হলাম। আমি অবশ্য এমনটাই মনে মনে আশা করেছিলাম। উনার অফিসের পর্দাটাও গ্রামীণ চেকের খুবই সাধারণ ডিজাইনের। পরে উনার সাথে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছিলাম উনি মারাত্মক এনালগ মানুষ। সাধারণ কাগজ কলম দিয়েই উনি সমস্ত কাজ সারেন।

প্রথমেই আমি ড. ইউনুসকে একটি কথা বলেছিলাম যা এখনও আমার মনে দাগ দিয়ে আছে। কেন সেদিন আমি এই কথা বলেছিলাম তার কারণ আমি জানিনা। আমি কি বিষয়ে কথা বলব, কি কি বলবো, আলোচনা করবো তা নোট করে নিয়ে গিয়েছিলাম। এই কথাটি বলার আমার কোন প্লান ছিলনা। কিন্তু কিভাবে জানি বলে ফেললাম। আমি বলেছিলাম, আপনি মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে কাজ করেন যেখানে মানুষের উপর কোন ভেদাভেদ থাকে না। যে কেউ লোন নেবার মত মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকেনা। আর আমি কাজ করি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে। এই প্রযুক্তিটিও মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করেনা। আপনি কম্পিউটারে ইন্টারনেটে কোন তথ্য বা ওয়েবসাইট দেখলে, কম্পিউটর বলেউঠেনা যে না তুমি গরিব কিংবা তুমি নারি তাই তোমাকে এই তথ্যটি দেখাবনা। তাই মাইক্রোক্রেডিট এবং তথ্যপ্রযুক্তির এর মধ্যে বেশ মিল রয়েছে। এই দুটি শক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীটাকে পালটে দেয়া সম্ভব।

আমার শেষ বাক্যটি বেশ শক্তিশালি ছিল, এবং বেশ আবেগেই বলেছিলাম। আমার কথা শুনে উনি হাসছিলেন। অনেক কথার পরে বলেছিলেন, দেখি আপনি কি আইডিয়া নিয়ে আনেন। ড. ইউনুসের মত একজন লোক আমার আইডিয়া শুনতে আগ্রহী !- এই জিনিসটি আমাকে ভিষন নাড়া দিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বেশ হোমওয়ার্ক করলাম ভালো কোন আইডিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। হ্যা একটি আইডিয়া নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম এবং তার গল্প পরে বলব।

আমাদের এই মিটিংএ আমি তার ওয়েবসাইটটির লগগুলি দেখালাম। মানুষজন কেমন দেখছে, কোথা থেকে বেশি একসেস হচ্ছে ইত্যাদি তথ্যগুলি উনাকে ব্যাখ্যা করলাম। পরবর্তিতে এই ওয়েবসাইটটিকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করলাম। গ্রামীন ভবণে গ্রামীণ সলিউশন বলে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানকে না দিয়ে ড. ইউনুস সেটি সরাসরি তার অফিস থেকে পরিচালনা এর কথা বলছিলেন। পরবর্তিতে উনার অফিসের একজন-কে আমি বুঝিয়ে দিই কিভাবে সাইটটিতে নতুন তথ্য সংযোগ ও আপডেট করতে হবে।

আমরা সেদিন কিছু প্লান ঠিক করলাম। উনি উনার ব্যাক্তিগত যোগাযোগের জন্য নতুন একটি সেন্টার তৈরী করবেন যার নাম দিয়েছিলেন, ইউনুস সেন্টার। সেই সেন্টার থেকেই ওয়েবসাইট মেইনটেইন করার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু ইউনুস সেন্টার শুরু করতে দেরী হবে, তাই তার আগ পর্যন্ত আমার উপরই ভার আসল সাইটটির তত্ববধান করার। সেদিন উনাকে যে প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলাম তার ফাইলটি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। [PDF file : 2008-03-03-1st-meeting]

মিটিং শেষে আসবার পরে, আমার কানে বাজতে লাগলো- দেখি আপনি কি আইডিয়া নিয়ে আনেন

পরবর্তি ৬টি মাস ধরে একটি নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করেছিলাম যার গল্প পরে আপনাদের বলব।

(চলবে)

Tags: ,

mashiur on September 15th, 2011

গবেষনার কাজের জন্য আমাকে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রন করা ও তথ্য সংগ্রহ করার জন্য প্রোগ্রামিং এর কাজ করতে হয়। প্রথম দিকে সি পোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করলেও পরবরর্তিতে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি দিয়ে দ্রুত কাজ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। সহজে ও দ্রুত পোগ্রাম করা যাবে এমন সিস্টেমের জন্য খোঁজ করছিলাম। আমেরিকায় থাকার সময় ল্যাবভিউ নামে একটি সলিউশনের নিয়ে কাজ করার সুযোগ হলো। এরপর যন্ত্রপাতির অটোমেশনের জন্য ল্যাবভিউ আমি প্রচুর ব্যবহার করছি। ল্যাবভিউ একধরনের গ্রাফিক্স প্রোগ্রামিং। মনে করা যাক আপনি সি প্রোগ্রামিং ভাষায় লিখছেন, আপনাকে পর্যায়ক্রমে প্রোগ্রাম করতে হবে। কিন্তু ল্যাবভিউতে সেরকম ভাবে কোড না লিখে বিভিন্ন আইকন ও ফ্লোচার্টের মাধ্যমে প্রোগ্রাম লিখতে হয়। তাই যারা প্রোগ্রামিং করতে ভয় পান ও জটিল মনে করেন, তারা ল্যাবভিউ ব্যবহার করে মজা পাবেন, কেননা এখানে সবকিছুউ লেগো তৈরী করার মত। আমি দেখেছি যারা কখনও কম্পিউটার নিয়ে কাজ করেনি, তারাও খুব সহজে এটি দিয়ে গ্রোগ্রাম করতে পারছে। আমরা যেখাবে কাজের পর্যায় দেখি বা visualizaiton করি, তেমন ভাবেই ল্যাবভিউ দিয়ে প্রোগ্রাম তৈরী করা যায়। আর কোন যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রন কিংবা তার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা – যাকে আমরা data acquisition বলি তা ল্যাবভিউ দিয়ে খুব সহজেই করা যায়। যন্ত্রপাতি কম্পিউটারে সংযোগ করার পরে ড্রাইভার জাতিয় সমস্যাগুলি ল্যাবভিউ খুব সহজে সমাধান করে। ল্যাবভিউ হল সফটওয়্যার, কিন্তু কম্পিউটার দিয়ে সুইচ, এনালড কিংবা ডিজিটাল তথ্য ইনপুট-আউটপুট করার জন্য আপনার প্রয়োজন হবে কোন একটি হার্ডওয়্যারের। আমি ছোট খাট কাজে LabJack যা কম্পিউটারের USB দিয়েই সংযোগ করা যায়, তা ব্যবহার করি।
তবে সমস্যা হল ল্যাবভিউ একটি বাণিজ্যিক সফটওয়ার এবং এর লাইসেন্স ফি অনেক। যারা কম খরচের কিংবা ওপেনসোর্সের কোন সমাধান চান তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিব পাইথনের সাথে। পাইথন একটি অপেনসোর্স প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ। যদিও পাইথন এর ইন্টারফেস ল্যাবভিউ এর মতন নয়। তারপরেও পাইথন ব্যবহারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
বিস্তারিত এর জন্য দেখুন:

  • http://www.ni.com/  ল্যাবভিউ তৈরীর প্রতিষ্ঠান
  • http://labjack.com/
  • http://www.python.org/

বাংলাদেশে যেয়ে সরাসরি ড. ইউনুসের কাজ করবার আগে বেশ হোমওয়ার্ক করতে হয়েছিল। আমাদের সাইটটি যেহেতু ড. ইউনুসের মূল মুখপাত্র হিসাবে কাজ করছিল, তাই ড. ইউনুসের অফিসের সাথে বেশ যোগাযোগ রেখে কাজ করতে হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপারে বেশ পড়াশুনা করলাম। একটি অদ্ভুত বিষয় আবিষ্কার করলাম, ক্ষুদ্রঋণ শুধুমাত্র কাজ করছে সেই সমস্ত দেশে যেখানে সাধারন ব্যাঙ্কিং ব্যাবস্থার দৌড়গোড়ায় গরীর-রা যেতে পারছেনা। সমস্যা হল এই গরীব শব্দটি খুবই আপেক্ষিক। ড. ইউনুস বাংলাদেশের মডেল বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করার চেষ্টা করছিলেন এবং বিদেশ থেকেও অনেক সংস্থা ড. ইউনুসের মডেল গ্রহণ করার জন্য আগ্রহী ছিল। আমি সারাটি জীবন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছি তাই আমার কাছে অর্থনীতির এই বিষয়গুলি একটু নতুন ছিল। আমি অর্থনীতির উপর আগ্রহ বোধ করি, এবং প্রচুর পড়াশুনা করি। সুবিধা হল আমেরিকার মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিটি খুবই ভাল ছিল এবং প্রচুর বই ছিল। মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয় মূলত অর্থনীতির বিষয়গুলির জন্য ভাল বলে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার প্রচুর ছেলেমেয়ারা বিবিএ পড়তে আসতো। আর তাই অর্থনীতির উপর খুব ভালো বই লাইব্রেরীতে ছিল।

মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর আরেকটি ভালো ব্যবস্থা ছিল, অন্য লাইব্রেরী থেকে বই বিনামূল্যে লোন নেয়া যেত। আমেরিকার যে কোন লাইব্রেরী থেকে বই লোন নেয়া যেত। তাই বলা যায় আমেরিকার যে কোন বই পড়ার সুযোগ আমার ছিল। আমি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সমাজে কিভাবে ভুমিকা রাখে সেইগুলি সমন্ধে জানতে পারলাম। একটা জিনিস উপলব্ধি করলাম যে শুধু মাত্র প্রযুক্তি এর বিষয়ে দক্ষ হলেই হবে তা নয়, বরং সেই প্রযুক্তিগুলি সমাজে কিভাবে ভুমিকা রাখতে পারে, কিংবা কাজে লাগানো যায় তা বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং এটি বাস্তব করাটি বেশ মজার। আমি বিজ্ঞানি থেকে উদ্দ্যোক্তা বা entrepreneur এর প্রতি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

সেই আগ্রহ থেকেই বেশ কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এর সাথে কাজ করা, কিভাবে প্রতিষ্ঠান তৈরী করা যায়, ব্যাংক লোন ও অনুসঙ্গিক বিষয়গুলি শিখতে লাগলাম যা পরবর্তিতে বাংলাদেশে যেয়ে আমাকে খুব সাহায্য করেছিল। আমার মটো ঠিক করি – Serving the society through technology। আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে এবং সেই সমস্যাগুলি মোকাবেলা করার জন্য অনেক অনেকভাবে কাজ করছে। আমি আমার জানা লব্ধ প্রযুক্তিগুলি দিয়ে সামাজিক সমস্যাগুলি সমাধান করার জন্য আগ্রহী হলাম।

২০০৬ থেকে ২০০৭ এর মধ্যে আমি নিম্নের বিষয়গুলি শিখলাম:

  • কারো সাথে কাজ করতে হলে তাকে খুব ভালো মত জানা প্রয়োজন
  • নিজের গন্ডি ছেড়ে বেরিয়ে চিন্তা করতে হবে
  • কোন জায়গায় এপ্রোচ করবার সময় বেশ কিছু নিয়ে এপ্রোচ করতে হবে
  • প্রযুক্তি ই সব কিছুর সমাধান নয়, সেটিকে প্রয়োগ করার কৌশলই গুরুত্বপূর্ণ

(চলবে)

২০০৭ এর পুরো বছরটি আমরা ব্যস্ত ছিলাম এই সাইটটিকে দাড় করবার জন্য। আমি বিভিন্ন ব্লগ, ইমেইল গ্রুপ, সংবাদপত্রে এই সাইটের জন্য উঠেপড়ে প্রচার করতে লাগলাম। বাংলাদেশের পত্রিকাতে প্রথম সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ১৪ নভেম্বর ২০০৬ [PDF file] আমি তৈরী করি এবং তা বিতরণ করি। ঢাকাতে ড. ইউনুসের অফিস থেকে আপডেট কোন সংবাদ আমাদের ইমেইলের মাধ্যমে পাঠাতো, এরপর আমরা সেইগুলি সাইটে আপডেট করতাম। টকিও থেকে নাজমুল ভাই ও তৌহিদ আমাকে সহযোগীতা করতো। এছাড়া পলাশও সহযোগীতা করতো। স্বেচ্ছাসেবক দিয়েই পুরো বছরটি আমরা সাইটটি আপডেট করি। আরো কিছু স্বেচ্ছাসেবক আমাদের সাথে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করল। আমি সহজে কাজগুলি করার জন্য ভিডিও টিউটোরিয়াল তৈরী করলাম। প্রথম দিকে অবাক হয়েছিলাম যে ঢাকাতে গ্রামিন অফিসে কেউ নেই যে এই সাইটটি মেইনটেইন করতে পারবে। পরে ঢাকাতে যেয়ে এর কারণগুলি উপলব্ধি করেছি যা পরবর্তিতে বলব। উল্লেখ্য যে আমাদের সাথে রাশেদ, শাহেদ, রাহাত, আসির ভাই, আজিম ভাইও কাজ করেছিল। এরা সবাই শশির সদস্য তাই আমাদের মধ্যে সুদৃ্ঢ বন্ধন ছিল। ঢাকার অফিসে আমাদের কারো উপস্থিতি থাকা খুব জরুরী হয়ে পড়ছিল। এইগুলি নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে ড. ইউনুসের অফিসে আসির ভাই ও তৌহিদ যোগ দেয়। তখন গ্লোবাল কমিউনিকেশন নামে একটি উইং ছিল এবং তারা সেখানেই যোগ দিয়ে কাজ করে। কারিগরি বিষয়গুলি তৌহিদ ভালো বুঝতে এবং ঢাকার অফিসে সে যোগ দেবার কারণে আমাদের খুবই সুবিধা হলো। তৌহিদ ঢাকা থেকেই সাইটটি আপডেট করতো এবং আমি তাকে সহযোগীতা করতাম। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ড. ইউনুসের সাথে কাজ করার জন্য প্রস্তাব আসছিল, এবং কিছু কিছু প্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রস্তাবনা ছিল। সেই প্রস্তাব গুলি মাঝে মধ্যে আমরাও রিভিও করে ঢাকার অফিসে আমরা মতামত জানাতাম। আমাদের টিমে প্রযুক্তিবীদ বেশ থাকাতে সেইগুলি রিভিও করে তার সমন্ধে মতামত জানাতে সুবিধা হত। বেশ চমতকার কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয় আমারা কে কোন প্রোজেক্টগুলির সমন্বয় করছি তা ইমেইলের মাধ্যেমে যোগাযোগ করতাম। আমি ও নুরুজ্জামান আমেরিকাতে থাকাতে আমরা দুজনের মধ্যে নিয়মিত টেলিফোনে কথা বার্তা হত। আমেরিকায় ইউনুস সেক্রেটারিয়ে নামে আরেকটি অফিস ছিল সেটির সাথেও আমরা সমন্বয় করে কাজ করতাম। এই বছরে ভিদার জর্গেনসন ও ল্যাকি লিপম্যানের সাথে কাজ যোগাযোগ হয়েছিল এবং কিছু কাজ করেছিলাম। বিদেশে ড. ইউনুসের সাথে কাজগুলি ভালোমত এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ড. ইউনুস আমাদের সাপোর্ট করতেন। কোন একটি মিটিং তৌহিদকে ড. ইউনুস বলেছিল, “নোবেল প্রাইজ পাবার কারণে আমাদের সাথে অনেকেই কাজ করতে চাইবে। এটি একধরনের সুযোগ এবং এই সুযোগগুলি তোমরা ঠিক মত কাজে লাগাও। বা এক কথায় বললে আমাকে তোমরা কাজে লাগাও।”

ড. ইউনুসের সাইটে কাজ করতে করতে আমি বেশ কিছু নতুন প্রযুক্তি এর সাথে কাজ করতে হয়। সেগুলি হল:

  • জুমলা, একটি কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। একটি সাইট অনেকজন মিলে তৈরী করা এবং খবর, প্রবন্ধ ও ছবি সহজে সংযুক্ত করা।
  • জুমলা এর বিভিন্ন ভাষার অনুবাদ এর সংযোগ। ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলা, জার্মান, জাপানিজ, মিয়েনমার / বার্মিজ, চিন ভাষার সংযোগ করি। এই সংক্রান্ত কারিগরি সমস্যাগুলি সমাধান করি।
  • পাঠকদের সাথে মতামত: আমরা সাইটটিতে পাঠকদের মতামত গ্রহন করার ব্যবস্থা রেখেছিলাম। যা একদিক দিয়ে আমাদের বেশ পীড়া দিয়েছিল। কেননা অনেকেই আজেবাজে মতামত দিচ্ছিল যা আমাদের প্রতিমুহুর্তে রিভিও করতে হোত।
  • VoIP : আমাদের কাজের সমন্বয় করার জন্য একটি ভালো কনফারেন্স সিস্টেম এর খুব প্রয়োজন হয়েছিল। এই সময় তৌহিদ আমাদের সাথে পরিচয় করে দেয় Asterisk নামে একটি VoIP এর প্লাটফর্ম। আমরা সেটি ব্যবহার করা শুরু করি। নাজমুল ভাইয়ের বাসাতে আমাদের সার্ভারটি বসান হয়। আমাদের সবার কাছে ফোন সেট ছিল। এই প্রযুক্তি এর ফলে আমরা বিনামূল্যে সহজে যোগাযোগ করতে পারতাম। পরবর্তিতে এই প্রযুক্তিটি নিয়ে আমি ভালোমত কাজ করি। দেখি এটি বাংলাদেশে পরিচয় করে দেবার জন্য চমত্কার একটি প্রযুক্তি। Asterisk আমি ভালোমত শিখে নিই এবং পরবর্তিতে ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত আমি বাংলাদেশে এটি প্রয়োগ করি। উল্লেখ্য নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি প্রথম ভিওআইপি এর কোর্স শুরু করি, যা ছাত্র/ছাত্রীদের মাঝে বেশ পপুলার ছিল।
  • সার্ভার: এই সময় লিনাক্স সার্ভার নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়। যা পরবর্তিতে আমাকে বেশ সাহায্য করেছিল।

২০০৭ এর শুরুতে সিদ্ধান্ত নিলাম বাংলাদেশে ফিরবো। ড. ইউনুসের অফিসে সরাসরি কাজ করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু সেখানে কোন পজিশন না থাকায় আমি অন্য জায়গাগুলিতে চেষ্টা করছিলাম। এই সময় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. আউয়াল ভাই শিক্ষাকতা করছিলেন। তার মাধ্যমেই আমি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে আবেদন করি। তারা আমাকে ২০০৮ এর জানুয়ারিতে জয়ন করবার জন্য নিয়োগপত্র দেয়। ২০০৭ এর ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসি।
(চলবে)

(এই লেখাগুলি পর্যায়ক্রমে লেখার চেষ্টা করবো। বাংলাদেশে ২০০৮ থেকে ২০১০ সন পর্যন্ত আমি বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রোজেক্টের সাথে সংযুক্ত ছিলাম। সেই সময়ের প্রোজেক্টগুলির ডকুমেন্ট তৈরী করার সময় হয়ে উঠেনি। যদি আমার অভিজ্ঞতা কারো কোন কাজে লাগে, সেই ভেবেই প্রোজেক্টগুলির কর্মকান্ড ডকুমেন্ট করার উদ্দ্যোগ নিলাম)

২০০৫ এর দিকে ড. ইউনুস নোবেল পাবার আগ থেকেই তার সাথে কিছু কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। প্রথম সুযোগ হলে ড. ইউনুসের জন্য ওয়েবসাইট তৈরীর জন্য। ড. ইউনুস নোবেল প্রাইজ পাবার আগ থেকেই আমরা বুঝতে পারছিলাম যে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যাক্তি হয়ে উঠবেন। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার নুরুজ্জামান-ই এই সংক্রান্ত উদ্দ্যোগ নেই। প্রথমেই নুরুজ্জামানের পরিচয় বলি। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সন পর্যন্ত আমি তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট করছিলাম। জাপানে (বিশেষ করে অনার্স ও ডিপ্লোমা কোর্সগুলিতে) যে বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশুনা করে তাদের গ্রুপের নাম হল শশী। এই শশীর একজন সদস্য হল নুরুজ্জামান, ডাক নাম পলাশ। আমরা তাকে পলাশ নামেই চিনতাম। যদিও সবসময় টেলিফোনের যোগাযোগ ছিল, কিন্তু তয়োহাসিতে পড়াশুনার সময়ে একবার পলাশের সাথে সরাসরি দেখা করলাম। বিভিন্ন কাজের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী এই কিশোরটিকে খুবই ভালোলেগেছিল। তারপরে নদীর স্রোতের মত আমি ও পলাশ বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ালেও পলাশের সাথে সবসময়ই যোগাযোগ ছিল। পলাশের একটি অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল, তা হল তার এনালাইসিস করার ক্ষমতা। ড. ইউনুস নোবেল পাবার কিছুদিন আগেই একদিন পলাশ ফোন করল। আমি তখন আমেরিকাতে মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈজ্ঞনিকের কাজ করছি। পলাশ আমাকে বুঝাল যে আমরা যদি ড. ইউনুসের উপর একটি ওয়েবসাইট করি তবে তা খুবই ভালো একটি উদ্দ্যোগ হয়। সেই সময়ে আমি ওয়েবসাইট তৈরীর সলিউশন জুমলা নিয়ে কাজ করছিলাম। এই ব্যাপারে আরো কয়েকজনের সাথে কথা বলার পরে তারাও আগ্রহ প্রকাশ করে। জাপান থেকে নাজমুল ভাই ও তৌহিদ সবার প্রথমেই আমাদের দলে চলে আসে। এরপরে আরো অনেকেই আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করল। যেহেতু কয়েকজন মিলে কাজ করবো এবং তাতে বিভিন্ন ভাষার তথ্য থাকবে তাই জুমলা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলাম। জুমলা নিয়ে টেকনিক্যাল কাজগুলি আমি ও তৌহিদ দেখছিলাম। প্রায় প্রতিদিনই আমরা কিভাবে সাইটটি করা যায়, দেখতে কেমন হবে, কি কি ফিচার থাকবে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা হোত। এমনও হয়েছে যে প্রতিদিনই আমরা কয়েকঘন্টা করে কনফারেন্স করেছি। আমরা সবাই দূর দূরান্ত থেকে এই প্রোজেক্টের জন্য কাজ করছিলাম। ড. ইউনুস নোবেল প্রাইজ পাবার পরে দেখা গেল আরো অনেকেই আমাদের মত ওয়েবসাইট তৈরী করেছে। কিন্তু আমরা যেহেতু গঠনমূলক ভাবে আগাচ্ছিলাম তাই শেষে আমাদের সাইটটি ড. ইউনুসের পছন্দ হল। সবথেকে যে জিনিসটি আমরা করতে পেরেছিলাম তা হল বিভিন্ন ভাষার তথ্য সংগ্রহ করা। আমরা বাংলা, ইংরেজী ও জাপানী ভাষা পারতাম। তাই এই তিনটি ভাষা দ্রুত সংযুক্ত করে দিতে পারলমা। তৌহিদের এক বন্ধু এই সময় এগিয়ে আসলে তা বার্মিজ (মিয়ানমার) ভাষাতে অনুবাদ করার জন্য। আমরা সাইটি শুরু করতে পারলাম ১৯ নভেম্বর ২০০৬ সনে। অনেকগুলি নাম সেই সময় রেজিস্ট্রেশন করলেও আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম http://muhammadyunus.org/ নামেই সাইটটি পরিচিত হবে। এই সময়ে টকিওতে ড. ইউনুস বেড়াতে আসলেন। আমরা আমাদের সাইটটি উনাকে দেখালাম। উনি পছন্দ করলেন। পরবর্তিতে আমরা বাংলাদেশে তার সাথে এই বিষয়ে মিটিং এর আয়োজন করি, এবং আমরা আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা বলি। মূলত শুধু মাত্র ওয়েবসাইট নয় এটি হবে মাইক্রোক্রেডিট সংক্রান্ত তথ্যমূলক সাইট। আমাদের সাইটটি অফিশিয়াল ভাবে ড. ইউনুস এবং তার অফিস অনুমোদন করল। সেই সময় গ্রামীন অফিসে এই সাইটটি মেইনটেইন করার জন্য কেউ না থাকায় আমরাই সাইটটি আপডেট করতাম। পলাশ পুরো ব্যাপারগুলি সমন্বয় করতো।

(চলবে)

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes
Improve Your Life, Go The myEASY Way™