আমরা আমাদের প্রোপজালের নাম দিয়েছিলাম, E-HEALTH CARE SOLUTION BY USING TOUCH SCREEN KIOSK. আমরা এই টাচস্ক্রীন কিউসক এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যসেবার পাশাপাশি ডাক্তার ছাড়াই কিছু সাধারণ টেস্টগুলি করা যাবে। আমরা নিম্নের টেস্টগুলি করার কথা বলেছিলাম,
- ইলেকট্রনিক্স স্টেথেস্কোপ
- ইসিজি মনিটর
- ব্লাড প্রেসার মিটার
- ব্লাড সুক্রোজ মনিটর
- ওমন মাপার যন্ত্র
ভবিষ্যতে এই কিউসক দিয়েই টেলিমিডিসিন বা দূরের ডাক্তারের সাথে কনসাল্টেশন করার সুযোগ রাখতে পারবো।
ড. ইউনুসকে যখন আমাদের আইডিয়াটি দেখালাম, তখন উনি খুব মনযোগ দিয়ে শুনলেন। শেষে আমাদের বললেন, আইডিয়াটি চমৎকার তবে আমাদের দেশে প্রয়োগ করার জন্য আরো কিছু পারিপার্শিক জিনিসগুলি নিয়ে ভাবতে হবে।
- তথ্য দেয়া হবে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে। আমাদের গ্রামের লোকজন এটিকে কিভাবে নিবে, তা ভাবতে হবে।
- গ্রামে বিদ্যুতের সংযোগ নাও থাকতে পারে, কিংবা বিদ্যুত মাঝেমধ্যে চলে যেতে পারে। এখানে তোমরা সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি এর কথা ভেবেছে।
- বিজনেস মডেলটি একটু দূর্বল রয়েছে। আমরা বিজনেস মডেলে বলেছিলাম যে তথ্য দেয়া বাবদ একটি চার্জ নেয়া যেতে পারে। হয়তো একটি প্রিন্টার লাগানো যেতে পারে যেখানে প্রিন্ট করলে একটি চার্চ নেয়া হবে। এমেশিনে যে টেস্টগুলি করা হবে, সেই টেস্টগুলি বাবদ একটি চার্জ নেয়া যেতে পারে। উনি বললেন এই সামান্য চার্জ গুলি দিয়ে ব্রেকইভেন কিংবা লাভজনক করা একটু কঠিন হবে।
- আমাদের গ্রামে যদি এমন একটি জিনিস বসায়, সেখেত্রে এটি রক্ষনাবেক্ষণের জন্য লোক প্রয়োজন হবে। আমরা সাধারণ ফার্মেসিগুলিতেই তা বসাতে পারে তাদের একটি নতুন সার্ভিস হিসাবে সংযুক্তি করতে পারি।
- আমরা এমন একটি যন্ত্র তৈরী করতে কেমন খরচ হবে ত হিসাব করে বলেছিলাম। কিন্তু কত বছরে লাভের টাকা তুলে আনা যাবে তা বের করতে পারিনি।
- পরিশেষে আমাদের কিছু কথা বললেন, যেখানে উনার দর্শন আমাদের সাথে শেয়ার করলেন। এই কথাগুলি আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল এবং পরবর্তিতে আমার কাজে এটি বেশ ভুমিকা রাখে।
ড. ইউনুস বললেন, দেখো মশিউর। আমরা মানুসের সেবা বিভিন্ন ভাবে করতে পারি। আমি একজন মানুষকে চা খাওয়ালাম, তাও কিন্তু এক ধরনের সেব। কিন্তু শুধু মাত্র বিনামূল্যে সেবা নয়, সেই সেবাটিকে যদি আমরা একটি বিজনেসের মডেলে নিয়ে আনতে পারি, তবে তাতে আমার সেবার কাজটিও হল আর সেই সাথে এটি একটি sustainable হল, বা সেই প্রোজেক্টটি নিজে নিজেই চলার ক্ষমতা অর্জন করল। লাভ করাটি পরে চিন্তা করা যেতে পারে। কিন্তু একটি প্রোজেক্টকে কিভাবে সাসটেইনেবল করা যায় সেদিকেই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের প্রোপজালটি তিনি বাদ দিয়ে দেননি, কিন্তু বললেন যে এটিকে সত্যিই সাসটেইনেবল করার জন্য আমাদের পদ্ধতি বের করতে হবে। এইরকম একটি সিস্টেম তৈরী করতে খরচ আছে, সেই খরচ কিভাবে তুলে আনতে হবে, কতদিনে তুলতে হবে তা আমাদের বুদ্ধি খাটিয়ে বের করতে হবে, অন্তত সংখার অংকগুলি যেন মিলে।
পরবর্তিতে এই প্রোজেক্ট কাজ করা ছেলে-মেয়েরা এটি তাদের কোর্সের প্রোপজাল হিসাবে জমা দিয়েছিল। এবং তা তাদের শিক্ষার একটি অংশ হিসাবেই ছিল। পরবর্তিতে এপলো এই প্রোপজালটিকে কোন এনজিও এর কাছে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা, তা নিয়ে চেষ্টা করেছিল কিন্তু তা খুব একটি সফল হয়নি। আমাদের গ্রুপের সবাই অন্যান্য পোজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর এটি নিয়ে কাজ হয়নি। আসেই এই আইডিয়াটিকে বিজনেস মডেলে রূপান্তর করা খুবই চ্যালেঞ্জিং এবং শুধু মাত্র একটি কোর ব্যবসা হিসাবে চালানো হয়তো কঠিন হবে। যারা এই সংক্রান্ত কাজ করে তাদের জন্য এটি একটি পাশাপাশি প্রোডাক্ট হিসাবে কাজ করতে পারে। যারা এনজিও তারা বিভিন্ন ধরনের আইডিয়া নিয়ে ফান্ড সংগ্রহ করে, তাদের জন্য হয়তো এটি সুন্দর একটি মডেল, কিন্তু সতন্ত্র একটি বিজনেস মডেল নয়। এই জিনিসটি আমরা উপলব্ধি করেছিলাম।
এই প্রোপজালটি নিয়ে আমি সার্থক হইনি। কিংবা এই আইডিয়াটি সূর্যের মূখ দেখেনি। সেটি নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। তবে এর মাধ্যমে একটি নতুন শব্দ শিখেছিলাম, business model – বিজনেস মডেল। এবং কোন প্রোজেক্টকে কিভাবে sustainable করা যেতে পারে সে ব্যাপারে সিরিয়াসলি চিন্তা ভাবনা করার পদ্ধতি শিখতে পেরেছিলাম। পরবর্তিতে আমার জীবনে আমি অনেক প্রোজেক্টের মুখোমুখি হই এবং ড. ইউনুসের কাছ থেকে শেখা চোখে – একটি প্রোজেক্টকে কিভাবে যাচাই করতে হবে, তার মূলমন্ত্র শিখি। এই শিক্ষাটিই আমি ড. ইউনুসের কাছে পেয়েছিলাম।
(পরিশেষে: প্রায় বছরখানেক পরের কথা, আমার এক ছাত্র চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র থেকে একটি ছবি নিয়ে এনে দেখাল। যেখানে একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান ঠিক একই রকমের টাস স্ক্রীণে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কিছু কিউসক প্রদর্শনিতে এনেছিল। আমি অবশ্য আর বিস্তারিত জানিনা। আমরা এই আইডিয়াটিকে ব্যবসাতে রূপান্তরে করতে না পারলেও ভারতের ব্যাঙ্গালোরে অবস্থিত নিউরোসিনাপটিক কমিউনিকেশন Neurosynaptic Communications নামে একটি প্রতিষ্ঠান ReMeDi™নামে একটি ডায়াগনোসিস সিস্টেম বাণিজ্যিকভাবে তৈরী করেছে যা দূরে বসেই টেস্টগুলি করা যাবে। তাদের যন্ত্রে শরীরের তাপমাত্রা, রক্তের চাপ, ইসিজি ও স্টেথেস্কোপ (হার্টবিট) মাপা যাবে। )
(চলবে)
Tags: Bangladesh, dr. yunus, e-healthcare, healthcare, kiosk, yunus
