গ্রামীণ সলিউশন ও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি

আমি জানুয়ারী ২০০৮ এর দিকে বাংলাদেশে যাবার পরপরই তৌহিদের সাথে যোগাযোগ করি, এবং তার কাছেই জানতে পারি যে ড. ইউনুস একটি নতুন বই লিখেছেন। সেই সময় তৌহিদ প্রথম আমাকে গ্রামীণ সলিউশনস এর প্রধান কাজী ভাইয়ের সাথে পরিচয় করে দেয়। কাজী ভাই্ও আমার মত বিদেশে ঘুরে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাই কাজি ভাইয়ের সাথে কাজ করতে কিছুটা সস্তি বোধ করছিলাম। প্রথমেই আমাকে কাজি ভাই, আমাকে সাধুবাদ জানালেন গ্রামীণ সলিউশনস-এ একসাথে কাজ করার। এবং কাজি ভাইয়ের সহায়তার কারণে সেখানে বেশ কিছূ প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। অবশ্য উল্লেখ্য যে আমি বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করেছিলাম, অনেকে বলেছিলো এইভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে লাভ আছে। আমার তখন বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা শুন্যের কাছাকাছি, তাই আমার জন্য কোন একটি জায়গা থেকেই শুরু করতে হবে। তাই গ্রামীণ সলিউশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইন্ডাস্ট্রি সমন্ধে শিখা শুরু করলাম।

গ্রামীণ সলিউশন সে সময় জাপানের মার্কেটে ঢুকবার চেষ্টা করছিল, এবং আমি তাদেরকে সেই ব্যাপারে সহায়তা করেছিলাম। আমার যেহেতু জাপানের কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল, তাই এটা খুব সাহায্য করেছিল। আমরা চেষ্টা করছিলাম জাপানের বাজার থেকে কিছু কাজ বাংলাদেশে নিয়ে আনতে। জাপানে আমি যোগাযোগ করলাম আলম ভাইয়ের সাথে। আলম ভাই সেই সময় আবে নামে এক জাপানিজের সাখে যৌথভাবে একটি কম্পানি তৈরী করেছিল বাংলাদেশ ও জাপানের মাধ্যে ব্যবসা বিস্তারের জন্য। তাদের একটি অংশে তথ্য প্রযুক্তি ছিল, এবং আমি্ও তাদের সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কাজ করার জন্য চেষ্টা করেছিলাম। আমরা বেশ কয়েকবার টেলিকনফারেন্স করলাম, এবং টুকটাক কিছু কাজ শুরু হলে্ও প্রোজেক্টটি খুব একটা এগোয়নি। আসলে মূল সমস্যা এইখানে ভাষা। কেননা কিছুকিছু যোগাযোগে আমি সহায়তা করলে্ও প্রতিটি ক্ষেত্রে ভাষার অনুবাদ করাটি কঠিন। একটি প্রোজেক্ট যখন শুরু হল তখন ইঞ্জিনিয়াররা কাজ শুরুল, তখন ভাষাগত সমস্যাটি প্রকট হ্ওয়া শুরু করল। জাপানে আমার আরো ভালোকিছু যোগাযোগ থাকলেও, এই সমস্যাগুলি উপলব্ধি করে আর সেগুলি নিয়ে আগান হয়নি। তবে একটি কথা উল্লখ্য, জাপান ও বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে যেয়ে বুঝতে পারলাম যে জাপানিজরা আউটসোর্সিই শব্দটির সাথে একেবারেই অপরিচিত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যখন বেশ জোরেসোরেই তাদের আনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রোজেক্টগুলির খরচ কমানোর জন্য আউটসোর্সিই করছে, জাপান তখন একেবারেই আউটসোর্স করছেনা। করলেও শুধুমাত্র চীন ও তাই্ওয়ান সহ কিছু দেশের সাথেই সীমাবদ্ধ। জাপানের এই মনভাবের কারণে বুঝতে পারলাম যে, আসলে জাপানিজরা আউটসোর্সিং কনসেপ্টে বিশ্বাস করেনা। জাপানীজরা কাজের ব্যাপারে যেরকম খুতখুতে তা আউটসোর্সের মাধ্যমে ডেলিভার করা সম্ভব নয়। সেই সময় বেসিসের উদ্দ্যোগে আয়োজিত সফট্ওয়্যার মেলাতে আমি গ্রামীণ সলিউশনকে সাহায্য করলাম জাপান থেকে আগত প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে যোগাযোগ করে দেবার।

পরবর্তিতে বুঝতে পেরেছি যে আসলে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রি সেই সময় ভারতের আউটসোর্সিং মডেলকে ফলোকরছিল। বাংলাদশের লোকজন সেই সময় ভাবছিল আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রটি যেহেতু বিশাল তাই ভারত থেকে্ও কিছু কিছু কাজ বাংলাদশে আসলে সেটি অংকে কম হবেনা। আসলে এই এপ্রোচের মধ্যে একটি ভুল ছিল। আসলে বাহির থেকে ভালো কাজ পেতে হলে ভালো কিছু কানেকশন এর প্রয়োজন, যেটি ভারতের ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাহিরে ভালো কানেকশন ছিলনা, অন্তত ভারতীয়দের মত ভালো নয়। ব্যাপারটি একটু বিস্তারিত বলি। আউটসোর্সিং এর কাজ যদিও বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই বিড (অনেকটা অকশনের মত) করে আনা যায়, তারপরে্ও ভালো কাজ পাবার জন্য বিদেশে ভালো কানেকশন দরকার। ভারতীয়রা সেই সময় বিদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানেই উপরের ম্যানেজমেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পজিশনগুলিতে ছিল। যেমন অনেক মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির এমডি বা সিইও আপনি পাবেন ভারত থেকে। তাই ভারতে পক্ষে বিদেশের কাজ বিশেষ করে আমেরিকা থেকে কাজ পেতে সুবিধা হয়েছে। বাংলাদেশীরা ভারতীয়দের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। তাই বিডিং এর মাধ্যমে খূব নগন্য হাতে গোনা কিছূ কাজ আমাদের আসছিল। অল্প কিছু কাজ পেয়েই আমি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের সন্তুষ্ট থাকতে দেখেছি, এর বেশী চিন্তা করার শক্তি ও সামার্থ হয়তো আমাদের নেই।

আমি পরবর্তিতে এই আউটসোর্সিং এর কনসেপ্ট বাদ দিয়ে প্রোডাক্ট এর দিকে গুরুত্ব দিই। একটি প্রতিষ্ঠানের বাজারের জন্য ভালো কিছু প্রোডাক্ট থাকলে তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যান্ডিং করা সম্ভব, যেটি শুধুমাত্র আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে করাটি কঠিন।

গ্রামীণ সলিউশনস এর কাজ করার সময় আমি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের সাথে মিশতাম, তাদের কাজ করার পদ্ধতি, স্কিল ও প্রোজেক্টগুলি সমন্ধে জানতাম। তাদের সাথে মিশে বুঝার চেষ্টা করতাম আমাদের তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রটিকে। বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে এই হোম্ওয়ার্ক করে একটি ভয়ংকর চিত্র পেলাম। আমি লক্ষ করলাম বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা একটু চিটিং স্বভাবের আছে। এরা অনেকেই দিনের বেলায় একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে এবং রাতে বাসায় ফিরে আউটসোর্সিং এর কাজ করে। দিনের কাজটি তার মাসিক বেতন তুলবার এক ব্যবস্থা আর আউটসোর্সিং এর কাজটি তার সাইড ইনকাম করার মত। এক সাথে এইভাবে দুটি দিকে কাজ করলে যে কোনটিই ঠিকমত হয়ে উঠেনা তা বোধদয় করবার মত সাবালক তারা হয়ে উঠিনি। জুনিয়র থেকে শূরু করে সিনিয়র সব ইঞ্জিনিয়ারদেরই এই অবস্থা। আমার মন হয় পেশাদারিত্বের এই অভাবের কারণে, বাংলাদেশ সামগ্রিক ভাবে এগুতে পারছেনা। কেননা বাহির থেকে কাজ নিয়ে আনলে্ও কাজ করাতে হচ্ছে বাংলাদেশের এই সমস্ত প্রযুক্তিবিদদের দিয়েই।

(চলবে)

Leave a Reply

*

Get Adobe Flash playerPlugin by wpburn.com wordpress themes
Improve Your Life, Go The myEASY Way™